উনি শুধু ফিল্ডেই থাকেন!

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গঙ্গাঁ গোবিন্দ পাল। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান চিকিৎসক ও প্রশাসনিক ব্যক্তি তিনিই। কার্যালয়ে তাঁর কক্ষের বাতি, ফ্যান সব সময় চালু থাকলেও তিনি থাকেন না দিনের পর দিন। গঙ্গাঁকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘ফিল্ডে আছি, পরে কথা হবে।’
রোগীসহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন কমকর্তার মাধ্যমে জানতে পেরে আট দিন আগে এ প্রতিবেদক গঙ্গাঁ গোবিন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। তখন তিনি বলেন, ‘ফিল্ডে আছি, পরে কথা হবে।’ এরপর প্রতিদিনই গঙ্গাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একই কথা বলেন।
গতকাল রোববার সরেজমিনে গঙ্গাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, তাঁর কক্ষের বাতি জ্বলছে, ফ্যান চলছে। বাইরে পিয়নও বসা। পিয়ন রিয়াজ উদ্দিন প্রথমে জানান, গঙ্গাঁ স্যার বাইরে আছেন। পরে যখন ভালোভাবে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেন, গঙ্গাঁ স্যার গত আট দিনে একদিনও স্বাস্থ্যেকেন্দ্রে আসেননি। সবাই যেন বোঝে তিনি কক্ষে আছেন তা বোঝাতে বাতি ও ফ্যান চালু রাখা হয়েছে।
ওই কক্ষে বসেই গঙ্গাঁকে ফোন করেন এ প্রতিবেদক। গঙ্গাঁ তখনো বলেন, ‘ফিল্ডে আছি, বিকেল ৫টায় ফিরব। আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অপেক্ষা করুন।’
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পিয়ন রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘স্যারের নির্দেশ অফিস সব সময় খোলা রাখতে হবে। যাতে বোঝা যায় কিছু আগেও কর্মকর্তা টেবিলে ছিলেন। আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তাহলে ফিল্ডে আছেন বলারও নির্দেশ রয়েছে।’ গঙ্গাঁ গোবিন্দ পালের অধীনে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরো ১২ জন চিকিৎসক কাজ করেন।
সিভিল সার্জনের দপ্তরে যোগাযোগ করলে সেখানকার কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধানের কখনোই মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কাজ করতে হয় না। কারণ তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কেন্দ্রের সব দায়ভার তাঁর।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, ‘ফিল্ডে’ থাকার নামে গঙ্গাঁ গোবিন্দ পাল পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় অবস্থান করেন দিনের পর দিন। প্রয়োজনীয় কাজে গঙ্গাঁকে পাওয়া যায় না। নথিপত্র স্বাক্ষর হয় না। এ অব্স্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও বেশির ভাগ সর্বশেষ ৩৩তম বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া নতুন চিকিৎসক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা কেউ এই প্রশাসনিক কর্মকর্তার ভয়ে মুখ খুলছেন না।
ধামইরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সাজেদুর রহমান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ধামইরহাটে যোগদানের পর থেকে গঙ্গাঁ গোবিন্দ পাল বেশির ভাগ সময় বিনা ছুটিতে নিজ পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় অবস্থান করে আসছেন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাকে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, ‘গঙ্গাঁ গোবিন্দ পাল যে কয়দিন ধামইরহাটে অবস্থান করেন তার বেশির ভাগ সময় থাকেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাইরে সূর্যের হাসি মার্কা ক্লিনিকে।’
সাজেদুর রহমান আরো বলেন, ‘গঙ্গাঁ গোবিন্দ পালের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ওষুধ পাচার, চিকিৎসক, নার্স, অন্য কর্মকর্তা ও রোগীদের সাথে অশালীন আচরণের অভিযোগ আছে।’ একই কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমানে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মেশকাত রায়হান।
এসব ব্যাপারে নওগাঁ সিভিল সার্জন এ কে এম মোজাহার হোসেন বলেন, ‘সরকারি নিয়ম বহির্ভূত কোনো কার্যক্রম এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে অফিসের বাইরে থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তাঁর (গঙ্গাঁ গোবিন্দ পাল) বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অভিযোগের এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।