ঢাবি শিক্ষক লীনা তাপসী খানের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মহসীনা আক্তার খানমের (শিল্পী লীনা তাপসী খান নামে সুপরিচিত) বিরুদ্ধে পিএইচডি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্যসহ বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরও বিষয়টি সিন্ডিকেটে ওঠেনি।
চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে শিল্পী লীনা তাপসী খানের পিএইচডি ডিগ্রি ও নজরুল পদক বাতিলের দাবি জানিয়েছেন নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক সংগীতশিল্পী ইফফাত আরা নার্গিস। আজ রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিল্পী লীনা তাপসী খান। তিনি দাবি করেছেন, এসবের কোনো ভিত্তি নেই। বরং তাঁর সুনাম ক্ষুন্ন করতে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এই বিষয়ে কেউ যথাযথ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে দেখা যেত। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কঠোর।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক সংগীতশিল্পী ইফফাত আরা নার্গিস বলেন, ‘আমার অভিযোগটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। কেবল উপাচার্য নন, দুজন উপ-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেটের সব সদস্যের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। কিন্তু তদন্তের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং লীনা তাপসী খান একজন জাতীয় অধ্যাপকের দোহাই দিয়ে বলে বেড়াচ্ছে যে, কেউ তাঁর কিছুই করতে পারবে না। এই সংবাদ যাতে প্রচারিত না হয় সেই ব্যাপারে তিনি তদ্বির করে বেড়াচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরেও তদন্ত করছে না, সেই রহস্য বুঝতে পারছি না।'
লীনা তাপসী খানের পিএইচডির গবেষণা 'নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার' নামের গ্রন্থটিতে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, '২৮০ পৃষ্ঠার গ্রন্থে ৮০ পৃষ্ঠার স্বরলিপি হুবহু নকল করে ঢোকানো হয়েছে মূল পাঠ হিসেবে। যা অনৈতিক। এই ৮০ পৃষ্ঠার স্বরলিপির স্থান হতে পারত গ্রন্থের পরিশিষ্টে। মূল পাঠে এই স্বরলিপি কোনোক্রমেই স্থান পাওয়ার কথা নয়। এটিও এক ধরনের চৌর্যবৃত্তি। ২৭৭ পৃষ্ঠার বইয়ের মধ্যে ৮০ পৃষ্ঠা স্বরলিপি, ২৬ পৃষ্ঠা শ্যামপ্রসাদ মুখোপধ্যায়ের গ্রন্থ, ৪৬ পৃষ্ঠা কাকলী সেনের গ্রন্থ এবং ১৭ পৃষ্ঠা পরিশিষ্ট। যা লীনা তাপসী খানের রচনা নয়। এগুলো অন্যের গ্রন্থ থেকে হুবহু নেওয়া। বাকি ১০১ পৃষ্ঠার মধ্যে ইদ্রিস আলীর নজরুল ইনস্টিটিউট ঢাকা থেকে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘নজরুল সঙ্গীতের সুর’ নামক গ্রন্থ থেকেও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু লীনা তাপসী খান তা অস্বীকার করেন।'
সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন নায়েমের সাবেক এই মহাপরিচালক। দাবিগুলো হলো- অভিযোগ তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মোতাবেক তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করা; এই ডিগ্রির জন্য প্রাপ্ত সব সুবিধা প্রত্যাহার করা; এই ডিগ্রি প্রদানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে শাস্তি প্রদান করা; এই ডিগ্রির ওপর রচিত গ্রন্থ 'নজরুল সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার' গ্রন্থটি বাতিলের জন্য কবি নজরুল ইনস্টিটিউট এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়া; এই গ্রন্থের জন্য প্রাপ্ত নজরুল পদক বাতিল করে নজরুল পদককে কলঙ্কমুক্ত করা।
অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যাপক লীনা তাপসী খান। তিনি বলেন, 'আমি নিজে নিজে জালিয়াতি করে কোনো সার্টিফিকেট বের করিনি। আমার একটা বোর্ড ছিল, সুপারভাইজার ছিল। আমার পিএইচডির সুপারভাইজার ছিল জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। আজ তাঁকেও প্রশ্ন করা হচ্ছে। তিনি (ইফফাত আরা নার্গিস) অন্যের প্ররোচণায় আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্ক্যান্ডাল রটাচ্ছেন, অথচ এর কোনো ভিত্তি নেই।'
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘বিষয়টি সিন্ডিকেটে একবার তোলা হয়েছিল। কিন্তু উপাচার্যসহ অন্যরা কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এজন্য আর কেউ এটা নিয়ে কথা বলেনি। এ ধরনের অপরাধ অত্যন্ত জঘন্য। যারা এ ধরনের অপরাধ করে তাদের নিয়মানুযায়ী শাস্তি পাওয়া উচিত।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, 'কেউ নিয়মনীতি অনুসরণ করে অভিযোগ করলে, তখন আমরা দেখতে পারতাম যে বিষয়টা কী। অনেক সময় তো বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ এলেই তো তদন্ত করা যায় না। এখানে মানুষের সম্মান-মর্যাদার বিষয় জড়িত থাকে। আর এসব বিষয়ে আমরা খুব কঠোর। অপরাধী যেই হোক না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’