শব্দের সৃষ্টিশক্তিতে বিশ্ববাসীর বাস্তবভুবন পরিক্রমা

১.
‘কমিউনিকেশন’-এর তত্ত্ব তাৎপর্য মাথায় রেখেও কবিতার দ্বিমাত্রিক চরিত্রের বাস্তবতা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। তা যেমন বিনোদনের উপভোগ্যতায় তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশে বলতে হয়, বহু পুরোনো কথা বিষয় ও প্রকরণের প্রতিযোগিতায় সামঞ্জস্য বিধানে কবিতার সফল পরিস্ফুটন ঘটতে অসুবিধা নেই। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের পথ ধরে কবিতা প্রায়শ রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বা দিকনির্দেশক।
প্রতিবাদী এ ধারাটির সূচনা পঞ্চাশের দশক তথা বিশেষভাবে একুশের ভাষা-আন্দোলনোত্তর সময়পর্ব থেকে। এর ক্রমবিকাশ ষাটের দশকের আবর্তে, উত্তাল তরঙ্গে চৈতন্যের জাগরণে যার সর্বোত্তম প্রকাশ ঊনসত্তর হয়ে সত্তরের দশকে মুক্তিস্নানে মূলত রক্তাক্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। একঝাঁক কবি তাঁদের কবিতার বর্শা হাতে ময়দানে হাজির। মসিযুদ্ধ নয় যেন অসিযুদ্ধ।
কবিতা অন্যান্য শিল্পসত্তার মতো কতটা সমাজ ও রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট, তার প্রমাণ বিশ্বময় ছড়ানো। বাংলাদেশের কবিতা এদিক থেকে মেঠোপথ বেয়ে পাকাসড়ক ধরে এগিয়ে গেছে, তৈরি করেছে কবিতার শরাশ্রয়ী ভিন্ন এক ময়দান। একে রণাঙ্গন বললে অত্যুক্তি হয় না। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের যে ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ দ্রুতই যুদ্ধোত্তর স্বদেশে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ব্যবধান ও বহুবিধ সমস্যার জালে সৃষ্টি নৈরাজ্যের কারণে প্রতিবাদী নিশানার ভিন্নমাত্রায় নিজেকে প্রসারিত করে।
করে কখনো তীব্র সহজ গদ্য ভাষ্যে, কখনো প্রাকরণিক ভিন্নতায়। ক্ষোভ, হতাশা কবিতাকে ক্রমশ ভিন্ন ভুবনের বাসিন্দা করে তোলেও কখনো নানা তত্ত্বের টানে, কখনো আত্মমগ্নতার গভীরতায় ডুবে। সেই যে কবে ‘শুদ্ধতম কবি’ প্রসঙ্গ এনে কবিতাকে নান্দনিকতার আপ্তবাক্যে ভিন্নপথগামী করে তোলার চেষ্টা চলেছিল, তার প্রভাবে কি না জানি না, যুদ্ধোত্তর কাব্যযাত্রায় আবারও ‘শুদ্ধ কবিতা’র তাত্ত্বিক প্রকাশ ঘটতে দেখা যাচ্ছে কখনো কখনো, কোথাও কোথাও।
কিন্তু এমন কথা ভুলি কেমন করে যে শিল্পমাত্রেরই তো শুদ্ধতার আকাঙ্ক্ষা, এমনকি সমাজ রাজনীতি ও সংস্কৃতি। ব্যক্তিচৈতন্যকে আলোকিত শুদ্ধতায় পৌঁছে দেবার আকাঙ্ক্ষা কোথাও কম নেই। দূষিত সমাজ কারো আকাঙ্ক্ষিত নয়, নয় কবিতারও। তাই সামাজিক অস্থিরতায় বিদ্রোহ-বিপ্লবে কবিতা-গান কম তাৎপর্য বহন করে না। হয়ে ওঠে মুক্তিসংগ্রাম বা সমাজবদলের প্রেরণা বা হাতিয়ার।
সত্তরের দশকের কবি হিসেবে পরিচিত (যদিও দশক পরিচিত নানা কারণে বিতর্কিত) বিমল গুহ আপন গুণপনাতেই বাংলাদেশের কাব্য-অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কাব্যভাবনায় এমন সত্যের প্রকাশ ঘটেছে যে ‘কবিতার ইতিহাস এক অর্থে সমাজ-সংস্কৃতিরই ইতিহাস। সমাজ পরিবর্তনের তাগিদ কবিরা যখন অনুভব করেন, তখন তার রূপায়ণ কবিতার মাধ্যমে তাঁরা করে থাকেন। সুতরাং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কবিতাও একটি ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনকি স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনেও আমরা দেখেছি কবিতার শব্দ বুলেটের মতো আঘাত হেনেছে প্রতিপক্ষের মনোভূমিতে ইত্যাদি। পাশাপাশি কবিতার নান্দনিক রূপশিল্পে তার সমান বিশ্বাস ও আগ্রহ পৃর্বোক্ত দ্বিসক্রিয় ধারায়।
সামাজিক-রাজনৈতিক বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে কবিতার চরিত্রবদল ঘটে সমাজ-সচেতনতার হাত ধরে। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বড় হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসাবে বলা চলে ‘একুশের কবিতা’ ষাটের দশকের জাতীয় চেতনার কবিতা এবং ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’র কথা। কবিতা তখন রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কখনো লক্ষ অর্জনের হাতিয়ার। বাংলা কবিতার এ চরিত্র বহুস্বীকৃত ঐতিহ্যের অন্তর্গত (‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ ইত্যাদি)।
‘কবিতার দায়, কবিতার অঙ্গীকার’ বিশ শতকের প্রথম দিক থেকেই বাংলা কবিতায় বিশেষ জপ পরিগ্রহ করে, যা চল্লিশের দশকে এসে ঝোড়ো হাওয়ার চরিত্র অর্জন করেছিল। কবিতার দায়, কবিতার মুক্তি ঘটে বিক্ষুব্ধ আত্মপ্রকাশে। সত্তরের দশকে এসে বাংলাদেশের কবি বিমল গুহই-বা ওই ভিন্নপথের যাত্রিক হবেন না কেন সময়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে। মাটি ও মানুষের আর্তনাদ তাঁকে বিচলিত করবেই, প্রতিক্রিয়া ঘটাবে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী পঙক্তিমালার প্রকাশে।
শব্দ হয়ে ওঠে লক্ষ্য অর্জনের তপ্ত সীমা। তবে তার শব্দচয়নে কাব্যভাষার পরিবর্তন ঘটে বিষয়ের আত্যন্তিক প্রয়োজনে। বিশেষ করে, প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশে। বিশেষ বিশেষ উপমা প্রতীক ও চিত্ররূপের নির্ভরতায়। সেখানে থাকে বিষয়ানুগ ইঙ্গিতার্থক তাৎপর্য এবং কিছুটা হলেও রঙের উদ্ভাস কবিতার এজাতীয় বৈশিষ্ট দশক দুই আগে দেখা গেছে একুশের কবিতায়। মাটি মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে ত্রিবিধ বাস্তবতায়।
বিমল গুহর কবিতায় মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও ব্যক্তিক অনুভবের গভীরতা সমান আন্তরিকতায় উপস্থিত। তিনি ব্যক্তিগত ভাবনার প্রকাশে শুদ্ধতার কথা বলেছেন। শুদ্ধতার সঙ্গে সৌন্দর্যেরও আত্মিক সম্পর্ক, নান্দনিক সম্পর্ক। কবিকে তাই দ্বিমাত্রিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বিষয়ের সঙ্গে প্রাকরণিক সৌন্দর্যের মিলন ঘটিয়ে শব্দ ও ধ্বনির বৈচিত্র্য নিয়ে পথ চলতে হয়। বিমল গুহর কবিতা এ বিষয়ে সচেতনতার স্বাক্ষর বহন করে। সেখানে স্বাদেশিকতায় সিক্ত সমাজ-সচেতনতা কবির রাজনৈতিকবোধ ঋদ্ধ করেও মতাদর্শগত সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটায়নি।
বাংলাদেশি কবিতার বৈশিষ্ট্য ব্যক্তক ঐতিহ্যধারায় নরনারী প্রেম, স্বদেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম, ও প্রকৃতিপ্রেম একাকার হয়ে কবিতাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে স্বভাবসিদ্ধ বৈচিত্র্যে। এ ক্ষেত্রে নবীন-প্রবীণে প্রভেদ সামান্য। বিমল গুহ এই স্রোতে অবগাহন করেও আপন শাব্দিক ও প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। সত্তরের দাহ ও দ্রোহ দুইই চৈতন্যে ধারণ করে এবং বিপর্যস্ত সময় অতিক্রম করে সমকালীন কবিদের মতনই তারও পথচলা ক্ষোভ ও কিছুটা হতাশকে সঙ্গী করে। এ ধারা প্রসারিত স্বৈরাচারবিরোধী সময়পর্বেও। যে জন্য শহীদ নূর হোসেন তাঁর কাব্য পঙক্তিমালার বিষয় হয়ে ওঠে। ওঠে প্রতিবাদী বার্তা রচনায়।
এসব রচনায় কখনো কখনো পঙক্তি বিশেষ অসাধারণ হয়ে ওঠে। যেমন ‘কবিতার আজ নিশানা হয়েছে যুদ্ধে যাবার’ যা মনে করিয়ে দেয় কবি হেলাল হাফিজের বহু উচ্চারিত বা উদ্ধৃত কাব্যপঙক্তি ‘এখন যৌবন যার’ ইত্যাদি। শহিদ সেলিম ও দেলোয়ারের উদ্দেশে লেখা কবিতায় (‘লিফলেট বোঝাই ট্রাক’) ‘সারিবদ্ধ ট্রাক। যৌবনের বাতিক তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে দিগ্বিদিক’। রক্তে আর লিফলেট একাকার হলো রাজপথ। সত্তরের দশক আমাদের জন্য হয়ে উঠেছিল মুক্তির দশক যদিও বহুখ্যাত স্লোগানের তুলনায় ভিন্নঅর্থে। তথাপি স্বাধীন স্বদেশ কম পাওয়া নয়, যদিও সে স্বদেশ শ্রেণিবিশেষের স্বার্থপূরণে অঙ্গীকৃত। তবু সে অর্জনে কম রক্ত ঝরেনি। বিনিময়ে :
‘রক্তলাল-সূর্যআঁকা স্বাধীন পতাকা… উত্তোলিত হাতের মুঠোয় জোড়া জোড়া রক্ত গোলাপ।’
অনেক পিতার অন্তর্ধানে’, অনেক পিতার রক্তভাসানে, অনেক মাতার ক্ষতবিক্ষত লাশের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন স্বদেশে পাথর চাপা কষ্ট বুকে চেপে কবিকে লক্ষ্য করতে হয় :
‘একদল নষ্ট মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়,
ছুঁড়ে দেয় নষ্ট আওয়াজ এই নষ্ট প্রজন্মের দিকে।
অবাঞ্ছিত পরিবেশে মনে পড়ে যায় একাত্তরের ঘাতক সময়ের বীভৎস তৎপরতা
‘কী বীভৎস সেই কালো দুপুরের রোদ!
আমার চোখের মণি ছিটকে পড়ে আকাশে আকাশে’
২.
স্বাদেশিকতা বোধের পাশাপাশি সমাজচেতনা, মানবিক চেতনা এই কবির মননধর্মের অন্তর্গত। অনাকাঙ্ক্ষিত যদিও তবু নষ্ট ভ্রষ্ট দূষিত বাংলাদেশি সমাজ শুদ্ধতাপ্রত্যাশী কবির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে না। ছোট ছোট স্তবকে হৃদয়ের সে প্রতিক্রিয়াকে ভাষা দিয়েছেন কবি। আবার কখনো শব্দচিত্রে বেদনার্ত অনুভব তুলে ধরেছেন :
‘রাজপথ, অলিগলি, ভাঙাপুল জলাভূমি পার হলে
দেখবে ক্ষুধার অতি মানুষের মুখ সারি সারি
দেখবে মৃত্যুও যেন ফেরি করে জীবন বীমার পোষ্টার
রাস্তায় রাস্তায়।
আরো কিছু দূরে গেলে দেখতে পাবে
ভাঙা সানকি, মাটির কাঁকর আগে পিছে
বাঁপাশে শিয়াল শকুনের কোলাহল অছির ভাগাড়’,
‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এমন বিবেচনা কবি মাত্রেরই, অথবা অধিকাশ কবিরই। এ সহজিয়া পথ না মাড়িয়ে কোনো মতাদর্শের কবিরাই উপায় নেই। বিমল গুহও প্রতিক্রম নন। রাজনীতির কানামাছির’ মধ্যেও তিনি মানুষের নিশনো খোঁজেন। বলা বাহুল্য সৎ মানুষের। অন্ধ না হলে চোখে পড়ে :
ধ্বংসের চরম সত্যে মানুষ ধ্বংসের কালোছায়া
হিংসার চরম সত্যে মানুষ পশুর কাছাকাছি।’
দূষণ-জর্জরিত স্বদেশে শুদ্ধ সমাজ, সৎ মানুষের সন্ধান মেলা ভার। শোষণ আর বৈষম্যে স্বাধীনতার লাল সূর্য যেন আস্তগামী এক নক্ষত্র যে অন্ধকারে বিলীন হওয়ার পথে। একই পরিণতি যে বিপর্যস্ত স্বদেশের :
মানুষের বাহাকারে ভারাক্রান্ত আমার স্বদেশ
অন্ধকারে হামাগুড়ি দেয়।
এমন এক উপলব্ধি ক্ষুব্ধ কবির চোখে ‘ক্রোধের আগুন’ উপলব্ধি হতাশার চিত্র আঁকে :
কোথায় দাঁড়াবে গিয়ে শান্তিপ্রিয় দেশের মানুষ
শ্বাস নেবে মুক্ত হাওয়ায়।
হতবাক বনতার সারি এখনো দাঁড়িয়ে আছে
ধ্বংসের কিনারে,
আগামী প্রজন্ম কাঁদে মুখ থুবড়ে একাকী রাস্তায়।’
তবু আশা মৃত্যুহীন। ভরসা শুদ্ধচেতনার মানুষের ওপরও, তার শব্দ সৃষ্টির ওপর :
‘সে রাতের ক্লান্ত শব্দগুলি নিঃস্তবকতা ভেঙে এসে
দাঁড়ায় গৌরবে এক ফসলের মাঠে—
মনে হয় কপালে তিলক পরে শতাব্দীর
সূর্যসন্তান সমগ্র মাঠ জুড়ে বুক পেতে আছে।’
শব্দসৈনিক শব্দের মিছিল নিয়ে এমন এক পরিস্থিতিতে রাজপথে নামবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ :
‘স্বাধীনতার পর
এখন আমরা স্বাধিকারের লড়াইয়ে মুখোমুখি পরস্পর।’
সে প্রতিবাদী শব্দের মিছিলও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ বলে ধরা যেতে পারে। বিমল গুহ মনে হয় :
বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের মতো প্রতিবাদে পেটে পড়ে তামাম দুনিয়া দীর্ঘ রাজপথ জুড়ে প্রতিবাদী শব্দের মিছিল হাঁটে-হাঁটে অন্তহীন।’
এই প্রতিবাদী মিছিলের লক্ষ্য যে শান্তিবাদী বিশ্ব গঠনের তাগিদে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একুশ শতকে পৌঁছে কবির অবস্থান যুদ্ধের বিপক্ষে রচিত পঙক্তিমালায় পূর্বোক্ত ইচ্ছার প্রতিফলন কবির মানবিক চেতনার গভীরতর প্রকাশ ঘটায়—মানব ঐক্য সেখানে প্রধান বিষয় :
‘যতই বিভেদ টানি ততই হয়েছি একাকার
যখনই দু-চোখ বুজি আলোকিত হয়েছে আঁধার।’
মানব সম্বন্ধ, মানব ঐক্য, মানব কল্যাণ এই ত্রিবিধ বিষয়ে অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। তার হাতে হিবার্টে বক্তৃতার পাণ্ডুলিপি : শিরোনাম ‘দ্য রিলিজিয়েন অব ম্যান’। মনুষ্যত্ববাদী মানবধর্ম নিয়ে বিমল গুহসহ একাধিক কবিকে কলম চালাতে হয় সমাজে নতুন চেহারায় আবির্ভূত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে।
৩.
নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব কবিমাত্রেরই চৈতন্যের আশ্রয়। কাজ যা নমা কথাশিল্পী যিনি শতবর্ষ নিঃসঙ্গতা নিয়ে উদ্ভব ভুবন রচনা করে না কলাকৈবল্যবাদী বাঙালি কবিকে ও বলতে হয় : বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী। নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে কী এক আনন্দময় ভুবন গড়ে তোলেন রবিকবি পদ্মাতীরে এসে। বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে শামসুর রাহমান থেকে একাধিক কবি নিঃসঙ্গতার নান্দীপাঠ করেছেন।
সেই ঐতিহ্যবাহী নান্দনিক নিঃসঙ্গতাকে বাস্তবের রৌদ্রতাপে ভুখ মিছিলে ভিন্ন মাত্রায় ত্রঁকে তুলেছেন বিমল গুহ।
‘একটি সত্যকে তুমি গোপনে লালন করেছো বহুদিন
তুমি নিঃসঙ্গ।
তোমার নিঃসঙ্গতা মানে অবসন্ন শরীর
তোমার নিঃসঙ্গতা মানে ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিলে
প্রেমের ফিকির
তোমার নিঃসঙ্গতা মানে সুন্দর অসুন্দরের বৈষম্য
তুমি সত্যের কাছে হার মানলে
তুমি সুন্দরের কাছে হার মানলে।’
তা সত্ত্বে শব্দ নিয়ে, কবিতার নিয়ে এই কবি’র এক ধরনের ‘অবসেশন’ আছে। মালার্মের শব্দতত্ত্ব না হলেও শব্দের বৈচিত্র্য ও শক্তিমত্তা নিয়ে তার মুগ্ধতা অধিকতর শক্তিমান। শক্তিমান অন্য যে-কোনো নান্দনিক বোধ থেকে। বিষয়টি তার কবিতার বিশেষ মর্যাদায় আসীন।
‘কিছু শব্দ ক্রোধে অভিমানে বেড়ে ওঠে আপন স্বভাবে
উচ্চারিত হতে হতে স্বভাব বদলায়।...
শব্দ, ধ্বনি কিংবা সুর যা’ই হোক
ব্যবহৃত হতে হতে নিজের বৈভব ফিরে পায়...
মূলত শব্দই মূর্ত শক্তিমান ধ্বনি
উচ্চারিত হতে হতে বয় : প্রাপ্ত হয়।’
শব্দকে নিয়ে কবি বিমল গুহর বেসাতি রাজপথ থেকে শস্যের প্রান্তরে। শব্দ-প্রতিশব্দ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার তার পথ চলা শুরু সেই বাহাত্তর থেকে (অহংকার, তোমার শব্দ) শব্দের আকর্ষণে পথ চলা, ‘শব্দ শব্দ খেলা, সম্ভবত লক্ষ শুদ্ধ নান্দনিকতার কতটা কাছে পৌঁছানো যায়। কবির আপন ভাষ্যে :
‘শব্দের ভেতরে শব্দ খেলা করে,
আমি তাকে পারিনি নিজের করে নিতে
কাছে টেনে নিতে।
যতই এগিয়ে যাই
শব্দ শুধু শব্দের ভেতরে ডুব দেয়, কোনদিন
ভেজাচুলে আলুথালু উঠে আসে দ্বিধাহীন হাতে...
এ এক বিষম খেলা
খেলতে খেলতে কেউ কেউ পায়’।
নান্দনিক শাব্দিক মুগ্ধতা তন্ময়তার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হয় কবিকে। রক্তের অক্ষরে সমাজ বাস্তবতার সত্যকে চিনে নিতে হয়। নিতে হয় ‘আঘাতে, বেদনায়’, রক্তের ঢেউ তোলা জল স্রোতের টানে। যেমন চিনে ছিলেন মহত্তম মনীষা কবি রবীন্দ্রনাথ।
বিমল গুহর কবিতা বাস্তবতার অনুধাবনে শব্দের নান্দনিক ভাবনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তার শব্দ অন্বেষা মাঠ ময়দান নদীনালা-শস্যক্ষেতসহ সর্বত্র জীবনের প্রকাশ ঘটাতে চায়। স্বদেশ চেতনা, প্রতিবাদী চেতনা শব্দের ঘোমটা খুলে দেয় :
‘মুক্তির কবিতা তাকে উস্কে দেয় আলো
নুড়ি ও পাথরে তার একাকার শোভা।’
তার শাব্দিক অন্বেষা রাজনীতিকে ছেড়ে কথা বলতে পারে না ওই সমাজ গন্তব্যতার টানে। কখনো-বা ভাসিক জাতীয়তার টানে। একুশে একাত্তর একাত্ম হয়ে যায়। হয়ে যায় নেলসন ম্যান্ডেলার (‘মান্দেলা’) মুক্তিসংগ্রামের তাৎপর্য অনুধাবনে :
মান্দেলা কোনো একক কণ্ঠ নয়
মান্দেলা মানে মুক্ত বহ্নিশিখা;
সেই ধারাবাহিকতায় মনে পড়ে যায় স্বদেশি সংগ্রামের কথা :
‘বিংশ শতকে সাম্প্রদায়িক ধারা
কী করে মানুষ মানুষে বিভেদ টানে!
রক্তের লাল ভুলে কি গিয়েছে তারা
বাংলাদেশের একুশেরও সেই মানে।’
৪.
আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে উদ্ধৃতির কমতি। সবশেষে কবিদের পরম আরাধ্য প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে বিমল গুহরও মুগ্ধ উচ্চারণ আমাদের নজর এড়ায় না। প্রেম প্রেয়শী ও আকাঙ্ক্ষা একাকার করা অনুভূতির প্রকাশ ঘটান কবি বিমল গুহও। এবং তা কাব্যচর্চার সূচনালগ্ন থেকেই :
আগুন আকাশকে ছুঁতে পারে না
বিশ্বাস আকাশকে ছোঁয়,
বাতাস পাহাড়কে নাড়াতে পারে না
প্রেম পাহাড়কে নাড়ায়;
অনুভবের গভীর তাৎপর্যে ঋদ্ধ কয়েকটি পঙক্তি। কোনো প্রাচীন পাঠকের মনে পড়তে পারে এ রকম কাব্যপঙক্তি :
প্রেমে শীলা ভাসে জলে
ম’লে প্রাণ মেলে’ ইত্যাদি।
তা ছাড়া তার একটি কবিতাগ্রন্থের নামই তো ‘ভালোবাসার কবিতা’। এ ক্ষেত্রে উদ্ধৃতি দিতে গেলে অনেক অনেক পঙক্তি জড়ো করতে হয়। তাই দু-তিনটে পঙক্তি উদ্ধারে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা :
‘তুমি এলে মুখাবয়ব সূর্যের প্রথম আলোর
মতো দীপ্যমান’
কিংবা এসেছিলে তুমি একলা নিশীথে হেঁটে
ভরা বাদলের শব্দে...
সূর্যের রঙ দুলেছে কুঞ্জবনে...
ডেকেছিলে কাছে গোপনে কর্ণ মূলে’
এজাতীয় কয়েকটি পঙক্তি প্রেমিক কবিকে বুঝে নেবার পক্ষে যথেষ্ট।
উপমা, প্রতীক ও চিত্রকল্পও তার কবিতায় আপন বৈশিষ্ট্য—
তৈরি করেন বিমল গুহ। সেখানে কবি অনেকটাই সংযত এবং হার্দ্য। আতিশয্য তাঁর স্বভাবে নেই। তবে এ কথা ঠিক, যা আগে বলা হয়েছে যে শব্দের মহিমা নিয়ে ব্যবহারিক প্রাধান্য নিয়ে কবি বিমল গুহ একটু বেশি মাত্রায় সচেতন, তার বক্তব্যে তা স্পষ্ট।
৫.
বিমল গুহ এভাবে তার শব্দের ভুবন তথা কবিতার ভুবন গড়ে তোলেন আপন ধারায়। নিজস্বতা না থাকলে শব্দের কারিগরদের মধ্যে থেকে একজন যথার্থ কবিকে শনাক্ত করা যাবে কীভাবে? বিশেষ করে সে কবি যদি হন মিতভাষী, অনুচ্চ উচ্চারণে অভিলাষী? মাটি ও মানুষের কাছাকাছি এ কবির অবস্থান, তাই কবিতা নিত্য তাঁর দুয়ারে ফুল ফোটায়। পরিমিতিবোধ তাঁর শব্দ নিয়ে খেলাকে আতিশয্যে পৌঁছাতে দেয় না, দুর্বোধ্যতার দুয়ারে প্রবেশ করতে দেয় না। প্রসঙ্গত, একটি সত্য মানতে হবে যে শব্দ নিয়ে তার অবসেশন সত্ত্বেও বিমল গুহ তাঁর কবিতায় কলাকৈবল্যবাদের পাশ দিয়ে চলেন, পুরোপুরি ওই বৃত্তে প্রবেশ করেন না। এর বড় কারণ মাটি মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে তার সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ, ভাববাদী বিলাসিতা রক্তের ঋণে, বাস্তবতার টানে ভেসে যায়। তাই কণ্ঠে নিম্নে ধৃত উক্তি, তা আক্ষেপে হোক বা বাস্তবকে মর্যাদা দেবার প্রয়োজনে হোক—
ক্ষুধার ছায়া গোল বেঁধেছে চোখের কোণে
মলিন পুকুর
রাধা এখন একা একাই কুঞ্জবনে
ক্লান্ত দুপুর।
মোহন বাঁশি কে বাজাবে উদাস বনে
আগের মতো?
হায়রে জগৎ! ক্ষুধার সুরে কাঁপছে বাতাস
অবিরত।’
সুশ্রী, শ্রবণসুভগ ছন্দসুরের শব্দবিন্যাসের শুনে পঙক্তিগুলো যথা নিয়মে কবিতার মর্যাদা পেয়ে যায়। স্বপ্ন কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্ররূপের দান বিমল গুহর অধিকাংশ কাব্যপঙক্তিমালা।
মানুষের মধ্যে বাস্তবতার মধ্যে থেকে কবি তার কাব্য ভুবনের আকাশি নীলিমায় একাকী। এবং সেটা সৃষ্টির প্রয়োজনে, কবিতার প্রয়োজনে। কবি বিমল গুহর নান্দনিক একাকিত্ব এভাবে ব্যাখ্যা করা চলে। তখন বলতে হয় এ কবি শব্দের ভাবনায় নিমগ্ন থেকেও মাটি ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নন, নন শিকড় থেকে বিচ্যুত।
এমন এক মানস-বৈশিষ্ট্য সম্বল করে বিমল গুহ তাঁর কবিতার বাগান গড়ে তোলেন, যেখানে বর্ণময়তার আতিশয্য নেই, নেই চড়া স্বরের উচ্চকিত উচ্চারণ। সৃষ্টি ক্ষমতাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে কলমধারী হয়ে উঠতে পারেন কবি। সুখগুলো, আনন্দগুলো, দুঃখগুলো তার নির্বাচিত শব্দের মাধ্যমে আকাশের ধ্যানী মগ্নতা নিয়ে প্রকাশ পায় কবিতায়।
তাই তাঁর কবিতা যেমন প্রচারপত্র হয়ে ওঠে না। তেমনি শব্দসর্বস্ব ভাববাদের প্রতীক হয়ে ওঠে না। এ দুয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকার চোখ চালায় বিমল গুহর কবিতা কবির বহুকথিত শব্দ শব্দ খেলা সত্ত্বেও। যথাস্থানে সীমারেখা টানতে পারাও কবিতার জন্য সুখবর। মনে হয় এ সত্যটা মনে রাখেন কবি বিমল গুহ। এখানে তাঁর শক্তি, এখানেই তার সম্ভাবনা। কারণ আরো অনেকটা পথ তো হাঁটতে হবে তাঁকে। এবং তা কবিতার হাত ধরে।