মঙ্গল শোভাযাত্রা : শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নাকচ চারুকলা অনুষদের

বিগত বছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের হবে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের নববর্ষ উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘নববর্ষে ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। তবে এর মধ্যেই নতুন করে আলচনার জন্ম দিয়েছে ঢাবির চারুকলা অনুষদের ২৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ঘিরে। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘চাটুকারিতাপূর্ণ মনোভাবের’ অভিযোগ তুলে তা বর্জনের ঘোষণা দেন। তবে শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে এটিকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দিতে চাইছে কিছু মহল।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে এসব সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যের প্রতীক নিয়ে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, জুলাই শহীদ আবু সাঈদের ২০ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্য যুক্ত করাসহ নানা বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়ে আসছিল। তবে চারুকলা অনুষদ এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। এর মধ্যেই নতুন করে যোগ হয় চারুকলা অনুষদের ২৬তম ব্যাচের (২০১৭-১৮ সেশন) বিজ্ঞপ্তিটি।
গতকাল বুধবার (২৬ মার্চ) প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের ২০১৭-১৮ সেশন তথা, ২৬তম ব্যাচ (চারুকলা ৭০তম) এর শিক্ষার্থীরা আমাদের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। শুরুতেই সবার অবগতির জন্য জানাতে চাই, এবারের বৈশাখের আয়োজনের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই। মূলত বৈশাখ প্রতিবছর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট ব্যাচের তত্ত্বাবধায়নে এবং সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের যৌথ প্রয়াসে আয়োজিত হয়ে থাকে। যে আয়োজনের সম্পূর্ণ অর্থ অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। চারুকলার রীতি অনুযায়ী যা এ বছর আমাদের ব্যাচের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবারের আয়োজন একেবারেই চারুকলা অনুষদের পূর্বাপর রীতির ব্যতিক্রমীভাবে কোনোরকম শিক্ষার্থীদের সম্মতি ও সম্পৃক্ততা ছাড়া শুধু শিক্ষকদের সিদ্ধান্তে করা হচ্ছে, যা আমাদের বিশ্বাস ও ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া এবার একাডেমিকভাবে বৈশাখ আয়োজন করার এই সিদ্ধান্ত অনুষদে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, ছাত্র প্রতিনিধি কারও সঙ্গে কোনোরকম পূর্ব আলোচনা ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় খুবই অতর্কিতভাবে নেওয়া হয়েছে।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘উপরন্ত, শোভাযাত্রায় বানানো স্ট্রাকচারের ডিজাইন ও আইডিয়া সম্পূর্ণ শিক্ষকদের দেওয়া, চারুকলার আপামর সাধারণ শিক্ষার্থী এর সঙ্গে কোনোভাবেই সংযুক্ত ও অবগত না। শহীদ আবু সাঈদের স্ট্রাকচার সম্পর্কেও আমরা অবগত ছিলাম না এবং কারও ব্যক্তিগত মতাদর্শে আঘাত দেওয়ার পক্ষেও না আমরা। এহেন কুরুচিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত চারুকলার সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে নেওয়া হয়নি এবং চারুকলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ছিল না। অতএব এর জন্য অনলাইনে তৈরি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার দায় সমগ্র চারুকলার নয়, বরং দায়িত্বে থাকা নির্দিষ্ট কতিপয় আয়োজক এবং ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর বর্তায়।’
বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, “এবারের বৈশাখ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈশাখ। এ আয়োজনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের চাটুকারিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণে আমরা শিক্ষকদের আয়োজন করা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা ও শোভাযাত্রা সমর্থন করছি না। এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমরা এটুকু স্পষ্ট করে জানাতে চাই যে, আমরা মোটাদাগে প্রতিবছর চারুকলা অনুষদে আয়োজিত হয়ে আসা বৈশাখের আয়োজন নয়, বরং স্বজনপ্রীতিদুষ্ট ও দেশের পরিবর্তনকালীন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী এবারের ‘বৈশাখ ১৪৩২’ এর আয়োজন ও আয়োজক কমিটিকে আমরা, চারুকলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি, আমাদের এই সিদ্ধান্তকে সবাই সমর্থন ও সম্মান জানাবে।”
এ বিষয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে চারুকলার শোভাযাত্রায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে আয়োজন করা হতো। তবে ২০০৫ সাল নাগাদ এটিকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। যেহেতু এটি একাডেমিক কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এবার আমরা শুধু শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পেছনে দুটি মূল উদ্দেশ্য রয়েছে : প্রথমত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গৌরব যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে। এজন্য সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় এই আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছে।’
অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম আরও বলেন, ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিক আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কিন্তু কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে এটিকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দিতে চাইছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ১৯৮৯ সাল থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে। শুরুতে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরবর্তীতে ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটির নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।