ড. ইউনূস-নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে আলোচনা হলো যেসব বিষয়ে

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু (বিষয়) নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আজ শুক্রবার (৪ এপ্রিল) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৪০ মিনিটের এই বৈঠকটি আন্তরিক, ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক ছিল বলে জানায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ। ১৯৭১ সালে আমাদের কঠিন সময়ে ভারত সরকার ও জনগণের অকুন্ঠ সমর্থন আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।’
তবে, দুই দেশের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত ইস্যু থাকায় সম্পর্ক আরও জোরদারে সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় অধ্যাপক ইউনূস বিমসটেক-এর চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন এবং গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আহ্বান জানান।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হওয়ায় অভিনন্দন জানান এবং ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। দুই দেশের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু।’
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস ভারতের কাছে বিচারাধীন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে জানতে চান। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, যা ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার।’
অধ্যাপক ইউনূস ওএইচসিএইচআর-এর একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে। তিনি জানান, ওই প্রতিবেদনে আনুমানিক এক হাজার ৪০০ জন বিক্ষোভকারীকে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ১৩ শতাংশই শিশু। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার নির্দেশে বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের জন্য সামাজিক মাধ্যমকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে নয়, বরং একটি দেশের সঙ্গে।’
অধ্যাপক ইউনূস সীমান্ত হত্যার বিষয়টিও উত্থাপন করেন এবং এই ঘটনা রোধে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালিয়েছে এবং হতাহতের ঘটনাগুলো ভারতীয় ভূখণ্ডে ঘটেছে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্বেগের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার খবর অতিরঞ্জিত এবং বেশিরভাগই ভুয়া। তিনি এই বিষয়ে তদন্তের জন্য ভারতীয় সাংবাদিকদের বাংলাদেশে পাঠানোর আহ্বান জানান।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, ধর্মীয় ও লিঙ্গ সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার ওপর নজরদারি করার জন্য তার সরকার একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করেছে এবং এ ধরনের ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠক শেষে দুই নেতাই একে অপরের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন এবং দুই দেশের জনগণের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন—বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।