কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ

কিশোরগঞ্জ ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস ঐতিহ্য। প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যের বিখ্যাত নানা দর্শনীয় স্থান রয়েছে এ জেলায়। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের নাম কিশোরগঞ্জ পাগলা মসজিদ। পাগলা মসজিদের ইমরাত খুবই সুন্দর এবং নির্মাণশৈলীও বেশ চমৎকার। আধুনিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত পাগলা মসজিদটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। তবে দেশজুড়ে এর পরিচিতি অন্য কারণে।
পাগলা মসজিদ নাম শুনলেই বর্তমানে যেটি মাথায় আসে সেটি হলো মসজিদের দানবাক্স খুলেলই মেলে কোটি কোটি টাকা, বৈদেশিক মূদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার। এ মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। দেশের মানুষের মাঝেও রয়েছে নানা কৌতুহল। কারা দেন এসব টাকা, কেন এই কোটি টাকার দান আর কি হয় দানের টাকায় ?
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের হয়বত নগর এলাকার প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান হয়বত খানের অধীনস্ত তৃতীয় পুরুষ জুলকরণ খানের বিবি সাহেবা মূলত একদিন স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে দেওয়ানবাড়ির অদূরে নরসুন্দার তীরে এই পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এই তথ্য হয়বতনগর দেওয়ান বাড়ি থেকে পাওয়া। মসজিদের প্রতিষ্ঠাকালে এর ভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশ থাকলেও, এখন তা সম্প্রসারিত হয়ে এর মোট ভুমির পরিমাণ প্রায় ৫ একরের উপরে রয়েছে। পাগলা মসজিদের সঠিক ইতিহাস কারো জানা নেই।
জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় আড়াইশ বছর আগে এক আধ্যাত্মিক পুরুষ খরস্রোতা নরসুন্দা নদীর পানিতে মাদুর পেতে ভেসে এসে বর্তমান মসজিদের কাছে থেমে ছিলেন। তখন নদীর পানিতে মাদুর পেতে তার ভেসে আসা দেখে, তাকে ঘিরে আশেপাশে অনেক ভক্তকূল সমবেত হন। এরপর সেই পাগলবেশী আধ্যাত্মিক পুরুষ এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়সহ বিভিন্ন ইবাদত করতেন। ওই পাগলের মৃত্যুর পর তার সমাধির পাশে এই মসজিদটি গড়ে উঠে। যা কালক্রমে পাগলা মসজিদ ’নামে পরিচিত।
এই মসজিদটি শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে নয়, দেশের সবকটি জেলার সকল ধর্মের মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবেও বিবেচিত। এ মসজিদে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা রয়েছে। নারীরা মসজিদের পৃথক স্থানে নামাজ আদায় করেন। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে প্রচুর লোক সমাগম হয়। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বেশি আশায় দান খয়রাত ও বেশি হয়।
সকল ধর্মের মানুষ প্রতিনিয়ত মানতের নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, বৈদেশিক মুদ্রা, গরু-ছাগল, হাস-মুরগীসহ মানতের বিভিন্ন সামগ্রী দান করে থাকেন। তাই প্রতিমাসে শুধু দানের নগদ অর্থ আর বিভিন্ন দানসামগ্রী থেকেই এ মসজিদের আয় হয় কোটি টাকারও বেশি।
প্রতি তিন মাস পর পর খোলা হয় এই মসজিদের ১০টি লোহার দানসিন্ধুক। মসজিদের দানসিন্ধুকগুলো খুলতেই দেখা যায় শুধু টাকা আর টাকা। এসব টাকা বস্তায় ভরে নেয়া হয় ঐ মসজিদের দোতলায়। পরে, মসজিদের মেঝেতে বসে দিনব্যাপী টাকা গুনেন প্রায় দুইশতাধিক মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকসহ ৭০ জন ব্যাংক কর্মকর্তা।
গণনা শেষে মসজিদের ব্যাংক হিসাব নম্বরে টাকা জমা রাখতে সম্পূর্ণ পুলিশি নিরাপওায় দানের সব টাকা নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাংকে। এছাড়াও মসাজিদে মানতের বিভিন্ন দানসামগ্রীগুলো প্রতিদিন আসরের নামাজের পর প্রকাশ্য নিলাম ডাকের মাধম্যে বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ পরদিন ব্যাংক আওয়ারে মসজিদের হিসাব নম্বরে জমা রাখা হয়। যা পরে প্রতিমাসে ব্যায় করা হয় কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও মসজিদের বিভিন্ন রক্ষনাবেক্ষণের কাজে।
পাগলা মসজিদের টাকায় ২০০০ সালে মসজিদের পাশেই একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় ১৩০ জন এতিম শিশু পড়াশোনা করছে। মসজিদের টাকায় তাদের যাবতীয় ভরণপোষণ করা হয়ে থাকে।
মসজিদের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা রাখা দানের টাকা থেকে আশা লভ্যাংশ ব্যয় করা হয়, দুস্থ ও দূরারোগ্য রোগীদের মাঝে। এছাড়া মসজিদের মূল তহবিলের টাকা এখন আর কোথাও ব্যয় করা হচ্ছেনা বলেই জানিয়েছেন মসজিদ কতৃপক্ষ। কারন মসজিদের দানের টাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। যেটি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অন্যতম স্থাপত্য হিসেবে নির্মিত হবে। এজন্য আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানের এ কমপ্লেক্সটি নির্মিত হলে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসুল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। সেই সাথে ৫ হাজার নারীর নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থাসহ মুসুল্লিদের ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রতি অর্থবছর ওয়াকফ স্টেটের অডিটর দ্বারা মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয়। সবশেষ মসজিদের দানসিন্ধুক খুলে রের্কড পরিমান টাকা পাওয়া যায়। যা অন্যান্যবারের সকল রের্কড ভেঙ্গে তৈরি করেছে নতুন রের্কড। সর্বশেষ গেল বছরের ৩০ নভেম্বর গণনা শেষে ৮ কোটি ২১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৩০৪ টাকা পাওয়া যায়। যা ৩ মাস ১৩দিনে মসজিদের ১১টি দানসিন্ধুকে জমা পরেছিলো। যা অতীতের সব রের্কড ছাড়িয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিন মাস পর মসজিদের দানসিন্ধুক খোলার কথা থাকলেও সিয়াম সাধনার মাস উপলক্ষ্যে খোলা হয়নি। বরং মসজিদের ১০ টি দানসিন্ধুকের সাথে আরও অস্থায়ী দানসিন্ধুক যোগ করে ঈদুল ফিতরের পর দানসিন্ধুক খোলা হতে পারে বলে জানিয়েছে মসজিদ কতৃপক্ষ। সেই সাথে তারা ধারণা করছে, পূর্বের সকল রের্কড ছাড়িয়ে এবার নতুন রের্কড তৈরি হবে।
দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত মসজিদটিকে ২০১৬ সালে পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্সে নামকরণ করা হয়। মসজিদটি পরিচালনার জন্য ওয়াকফ প্রশাসন অনুমোদনকৃত একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটিতে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য সচিব। এছাড়াও মসজিদের খতিবসহ স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা এই কমিটিতে মসজিদ পরিচালনার কাজে দায়িত্ব পালন করছেন।