কাশ্মীরে গুম হওয়া সন্তানের খোঁজে মাটি খুঁড়ে চলেছেন এক বাবা

গত বছরের আগস্টে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে এক ভারতীয় সেনাকে অপহরণ করেছিল একদল লোক। অপহৃত সৈন্যের পরিবারের বিশ্বাস, সে আর জীবিত নেই। সেই সৈনিকের বাবা এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁর ছেলের দেহাবশেষ। সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবর।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দা মঞ্জুর আহমেদ ওয়াগাই প্রথম যেদিন শুনেছিলেন যে, তাঁর ছেলে শাকির মঞ্জুরকে অপহরণ করা হয়েছে, তার এক দিন পরই পুলিশ শাকিরের গাড়িটি খুঁজে পেয়েছিল। আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল গাড়িটি। আর, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় নয় মাইল দূরে একটি আপেলের বাগানে পাওয়া গিয়েছিল শাকিরের হালকা বাদামি রঙের শার্ট আর কালো রঙের টি-শার্ট।
শাকিরের পোশাকগুলো ছিল ছিন্নভিন্ন, আর তাতে ছোপ ছোপ রক্ত লেগে ছিল। এটুকুই, তারপর আর কিছুই পাওয়া যায়নি।
ঘটনার শুরু গত বছরের ২ আগস্ট সন্ধ্যায়। চব্বিশ বছর বয়সী শাকির মঞ্জুর তাঁর নিজ শহর শোপিয়ানে ঈদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাড়িতে গিয়েছিলেন। জায়গাটা হিমালয়ের পাদদেশে। সেখানে প্রচুর আপেলের চাষ হয়। শাকির মঞ্জুর একজন কাশ্মীরী মুসলিম। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
শাকিরের পরিবার বলছে, ঘটনার দিন শাকির বাড়ি থেকে তাঁর ঘাঁটিতে ফিরছিলেন। মাঝপথে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরা তাঁর গাড়ি থামায়।
‘তাদের (বিচ্ছিন্নতাবাদী) কয়েকজন লাফিয়ে তাঁর (শাকির) গাড়িতে উঠে পড়ে। এরপর গাড়িটি চলে যায়’, প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে বলছিলেন শাকিরের সর্বকনিষ্ঠ ভাই শাহনেওয়াজ মঞ্জুর।
তারপর শাকিরদের গাড়িটি কোথায় গিয়েছিল কেউ জানে না।

শাকিরের ছোট ভাই শাহনেওয়াজ আইনের ছাত্র। শাহনেওয়াজ বলছেন, মোটরবাইকে করে বাড়ি ফেরার সময় তিনি শাকিরের গাড়িটি দেখেছিলেন। গাড়িটি উলটা দিক থেকে আসছিল। শাহনেওয়াজের মনে আছে, গাড়িটি তখন অপরিচিত লোকে ভর্তি ছিল।
‘তুমি কোথায় যাচ্ছো?’ শাহনেওয়াজ বাইক থামিয়ে চিৎকার করে ভাইকে প্রশ্ন করেছিলেন।
‘আমার পেছন পেছন এসো না’, গাড়ি থেকে জবাব দিয়েছিলেন শাকির।
শাকির মঞ্জুরের অপহরণের পর নয় মাস পেরিয়ে গেছে। তাঁর বাবা এখনও ছেলের মৃতদেহ খুঁজে ফিরছেন।
শাকিরের বাবা ছেলের খোঁজ শুরু করেছিলেন সেই গ্রাম থেকে, যেখানে শাকিরের ছেঁড়া কাপড়চোপড় পাওয়া গিয়েছিল। এর আশপাশে আরও ৫০ কিলোমিটার জায়গা—যেখানে আছে ফলের বাগান, ছোট ছোট পাহাড়ি নদী, ঘন জঙ্গল আর গ্রাম—সবখানে তিনি তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন।
শাহনেওয়াজ তাঁর বাবাকে সাহায্য করার জন্য গত বছর কলেজে যাওয়া ছেড়ে দেন। তাঁরা কিছু নদী খোঁড়ার জন্য কয়েকবার খনন করার যন্ত্রও ভাড়া করেছিলেন।
‘কখনও কখনও আমাদের বন্ধু আর প্রতিবেশীরাও কোদাল-শাবল নিয়ে আমাদের সঙ্গে অনুসন্ধানে যোগ দিয়েছে’, বলছিলেন শাহনেওয়াজ।
শাকির নিখোঁজ হওয়ার পরপরই শাকিরের পরিবার একটি মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল গ্রামেরই একজন বয়স্ক লোকের, যিনি পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের হাতে অপহৃত ও নিহত হয়েছিলেন।
স্থানীয় পুলিশপ্রধান দিলবাগ সিং সম্প্রতি বলেছেন, শাকিরের অনুসন্ধান শেষ হয়নি। যদিও তিনি তদন্তের বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকার করেন।
বিবিসি ইন্সপেক্টর জেনারেল (কাশ্মীর) বিজয় কুমারের সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনিও কোনো জবাব দেননি।
স্থানীয় আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে সাত বছর পর তাদের মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। সরকারি দলিলপত্রে শাকিরকে ‘নিখোঁজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শাকিরের পরিবার এই ট্র্যাজেডির পর নিজেদের অপমানিত বোধ করেন।
‘আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। সে যদি জঙ্গীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে থাকে, তাহলে সরকার সেটা খোলাখুলি বললেই তো পারে। আর যদি সে জঙ্গীদের হাতে নিহত হয়ে থাকে, তাহলে কেন তারা তার শহীদ হওয়াকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না?’ বলেন শাকিরের বাবা।
কাশ্মীরে ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে, সেই গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে লোকজনের হঠাৎ করে এমন উধাও হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। গত ২০ বছরে এমন হাজার হাজার লোক নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
কিন্তু শোপিয়ান শহর ভারত-শাসিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে সামরিক উপস্থিতিও ব্যাপক। তাই, সেখানে একজন সৈনিককে গুম করা সহজ কথা নয়।
মঞ্জুর আহমেদ ওয়াগাই একজন মধ্যবিত্ত কৃষক। যেসব লোক নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকের পরিবারকেই দোটানার মধ্যে কাটাতে হচ্ছে।
এর একটি কারণ হচ্ছে, যেসব পরিবারের সদস্যেরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে বয়কট হওয়ার ঝুঁকি।
অন্যদিকে অনেকে মনে করে, ভারতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ তাদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে না।
মঞ্জুর আহমেদ ওয়াগাই বলছেন, তিনি তাঁর ছেলেকে সাবধান করেছিলেন যেন সে সামরিক বাহিনীতে যোগ না দেয়।
‘কিন্তু সে (শাকির) আমার কথা শোনেনি। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য তার ভীষণ আগ্রহ ছিল। সে কখনও হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ করেনি।’
নিরুপায় হয়ে শাকিরের পরিবার এখন পীর-ফকির আর মাজারের শরণাপন্ন হয়েছেন।
শ্রীনগরভিত্তিক স্বতন্ত্র সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলী বলেন, ‘মঞ্জুর আহমেদ ওয়াগাইয়ের সঙ্গে যেদিন আমার দেখা হয়, সেদিন ছিল রোববার। শ্রীনগরে সেই মেঘাচ্ছন্ন বিষণ্ণ দিনে তাঁকে দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। তিনি তখন মাত্রই একজন ফকিরের সঙ্গে দেখা করে ফিরেছেন। ওই ফকিরের নাকি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে, যা দিয়ে তিনি তাঁর ছেলের মৃতদেহ কোথায় আছে তা বলতে পারবেন।’
কিন্তু, মঞ্জুর আহমেদ তাঁর স্ত্রী আয়েশাকে বলছিলেন, ‘আমার ধীরে ধীরে এসব পীর-ফকিরের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।’
‘সেই ফকির আমাকে বললেন, যেখানে শাকিরের কাপড় পাওয়া গিয়েছিল, সে জায়গাটা ভালো করে খুঁজতে। কিন্তু, সেটা তো আমরা আগেই করেছি’, বেশ ক্রুদ্ধস্বরেই স্ত্রীকে বলছিলেন মঞ্জুর আহমেদ।
‘কাশ্মীরের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত—এমন কোন পীর-ফকির নেই, যাঁর কাছে আমরা যাইনি। আমার মেয়েরা তাদের সোনার গয়না পর্যন্ত এসব মাজারে দান করেছে। আমরা হাল ছাড়ছি না’, বলছিলেন শাকিরের মা আয়শা ওয়াগাই।
মঞ্জুর আহমেদ ওয়াগাই বলছিলেন, নতুন কোনো খবর পেলেই তিনি আবার খননকাজ শুরু করবেন।
মঞ্জুর আহমেদ বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে যথেষ্ট দিয়েছেন। যেদিন তার (শাকির) কাপড়চোপড় পাওয়া গিয়েছিল, সেদিনই আমরা বুঝেছি যে, সে আর বেঁচে নেই। আমরা তার জানাজাও পড়েছি।’
‘কিন্তু, আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন ওর মরদেহের সন্ধান চালিয়েই যাব’, বলেন মঞ্জুর আহমেদ।