সেরাদের সেরা হলেন হাফেজ মুহিবুল্লাহ মাসুম

দেশ-বিদেশে সাড়া জাগানো পিএইচপি কুরআনের আলো ২০২৫ অনুষ্ঠানে সেরাদের সেরা হয়েছেন হাফেজ মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ মাসুম (মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা ঢাকা), দ্বিতীয় হয়েছেন হাফেজ মুহাম্মদ হুসাইন আহমদ (জামালুল কুরআন মাদ্রাসা ঝিনাইদহ), তৃতীয় হয়েছেন হাফেজ মুহাম্মদ শোয়াইবুর রহমান (নেত্রকোনা জামালুল কোরান মাদ্রাসা), চতুর্থ হয়েছেন হাফেজ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল সানিম (আর রায়হান ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসা)।
আজ শুক্রবার (২৮ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটির মিডিয়া পার্টনার এনটিভি সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। টানটান উত্তেজনা, অনেকটা স্নায়ু চাপের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় রাউন্ড।
গ্র্যান্ড ফিনালে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন—হাফেজ মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ মাসুম (মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা ঢাকা), হাফেজ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল সানিম (আর রায়হান ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসা), হাফেজ মুহাম্মদ শোয়াইবুর রহমান (নেত্রকোনা জামালুল কোরান মাদ্রাসা), হাফেজ মুহাম্মদ হুসাইন আহমদ, (জামালুল কুরআন মাদ্রাসা ঝিনাইদহ)।
শাহ ইফতেখার তারিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হিফজুল কোরান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়েখ আব্দুল হক, আন্তর্জাতিক হাফেজ ক্বারি সিলেকশন বোর্ডে হাফেজ ক্বারি জহিরুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক হাফেজ শোয়াইব আল আজহারী, বায়তুল মোকাররম মসজিদের জ্যেষ্ঠ পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মো. মিজানুর রহমান।
সর্ববৃহৎ টেলিভিশনভিত্তিক জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা পিএইচপি কুরআনের আলোর চার প্রতিযোগীর মধ্য থেকে বিজয়ীকে বাছাই করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রথম বিজয়ীকে দেওয়া হয় চার লাখ টাকা, দ্বিতীয় বিজয়ী পান তিন লাখ টাকা, তৃতীয় অবস্থানে যিনি রয়েছেন তিনি পেয়েছেন দুই লাখ টাকা ও সর্বশেষ চতুর্থ বিজয়ীকে দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রত্যেক প্রতিযোগী সুযোগ পাবেন ওস্তাদসহ ওমরাহ পালনের সুযোগ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, বিশেষ অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও এনটিভির পরিচালক আলহাজ নুরুদ্দীন আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ সুফি মো. মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে অনুষ্ঠানটির পরিচালক সাইফুল্লাহ সাইফ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সারা দেশের হাজার হাজার প্রতিযোগীর মধ্য থেকে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে বাছাই করে আমরা টিভি অনুষ্ঠানের জন্য ৩৯ জনকে চূড়ান্ত করি। সেখান থেকে মাত্র চারজনকে বাছাই করা ছিল অনেক কঠিন কাজ। আমাদের বিচারকেরা ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ফাইনাল পর্যায়ে আসতে পেরেছি।’
এ সময় এনটিভির পরিচালক নুরুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান যার হাত ধরে হয়েছিল সেই আবু ইউসুফ সাহেবকে আজকের দিনে অনেক মনে পড়ছে। পিএইচপি কুরআনের আলোর যে চেয়ারম্যান, উনার সঙ্গে আমি রুমে অনেকবার কথা বলেছি। তিনি অনেক ভালো লোক ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক। পিএইচপি কুরআনের আলো ১৭ বছর ধরে চলছে। হাঁটিহাঁটি-পা পা করে এতদিন চলে এসেছে পিএইচপি কুরআনের আলো। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের অনেক জায়গায় অনেক চিন্তাবিদরা আমাদের এই বিষয় নিয়ে অনেক কথা বলছেন। খুব ভালো করছি। আমরা এখানেই না, দেশের বাইরেও ভালো করেছি। বিদেশেও আমাদের সুনাম আছে। আপনারা দেখবেন ছোট ছোট শিশুরা কী সুন্দর কুরআন তিলাওয়াত করছে। এটা বুঝাই মুশকিল, যে ছোট ছোট বাচ্চারা কীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করছে। তারা অনেক ছোট বাচ্চা। এটা আমাদের জন্য অনেক বিরাট ব্যাপার। বাংলাদেশের এই পর্যন্ত যারা গিয়েছেন, তাঁরা কিন্তু রেজাল্ট না নিয়ে ফেরেন নাই। প্রথম স্থান, দ্বিতীয় স্থান, তা অর্জন করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।’
নুরুদ্দীন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমি বেশি কিছু বলব না। গাজায় যে অসুবিধা হচ্ছে, গাজার জন্য সবাই দোয়া করবেন। ভারতে একজন নামাজ পড়ছেন, পুলিশ মারধর-লাথি মারছেন। আল্লাহ তাঁদের হেদায়েত করুক। এনটিভির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে আগামী ঈদের শুভেচ্ছা রইল। যারা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন ও যারা ভালো রেজাল্ট করেছ। এরমধ্যে যারা প্রথম স্থান, দ্বিতীয় স্থান ও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছ, তাঁদের সবার প্রতি এনটিভির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা এবং অগ্রিম ঈদ মোবারক রইল।’
কুরআনের আলো ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মুফতি মাহমুদ মহিউদ্দিন বলেন, মরহুম আবু ইউসুফের স্বপ্ন ছিল গোটা পৃথিবীতে কুরআনকে ছড়িয়ে দেওয়া। মুফতি মহিউদ্দিন আরও বলেন, আবু ইউসুফ আজকে আমাদের মধ্যে নেই। যার জন্য আমাদের মন ভারাক্রান্ত। গত রমজানে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন আমাদের ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা আবু ইউসুফ। আমরা উনার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আজকে এই ১৭তম বারের মত পিএইচপি কুরআনের আলো শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের মধ্যে কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা জানেন গত বছর আমাদের ইউসুফ রহমতুল্লাহের নেতৃত্বে দুবাইতে রেকডিং হয়েছে। উনার স্বপ্ন ছিল গোটা পৃথিবীতে কুরআনকে ছড়িয়ে দেওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে আমরা একদল কুরআন প্রেমিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে অনুষ্ঠানকে চলমান রেখেছি।
মুফতি মহিউদ্দিন বলেন, ইউসুফ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করছেন ইউসুফ ভাইয়ের দুই কলিজার টুকরা। আমরা দুই সন্তানের জন্য আপনাদের কাছে দোয়া চাই। আমরা পিএইচপি কুরআনের আলোর সহযোগিতা অস্বীকার করা নয়, কিন্তু স্বীকার কীভাবে করবো আল্লাহ তাহাল্লার দরবারে জানি না। বিশেষ করে আলহাজ মিজানুর রহমানের জন্য আমরা দোয়া চাচ্ছি। উনি অসুস্থতার কারণে আজকে এখানে আসতে পারেন নাই। কিন্তু উনার বড় ছেলে মহসিন ভাই এখানে এসে আমাদের ধন্য করেছেন।
আবু ইউসুফের ছেলে জায়েদ আল মামুন বলেন, আমার বাবা থাকলে হয়তো আরও সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠান করতো। অনেকে স্বপ্ন ছিলো তার। তিনি বলেন, পিএইচপি কুরআনের আলো ২০২৫ আজকে আমার বাবার স্বপ্নের অনুষ্ঠানে যারা এসেছেন সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আল্লাহ আমার বাবাকে নিয়ে গেছেন। সবার কাছে তার জন্য দোয়া চাই। আমি বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাতে চাই আলহাজ মিজানুর রহমান স্যারকে। আমি কিছুদিন আগে শুনেছি অসুস্থ ছিলেন। আল্লাহ তাকে সিফা দান করুক। তিনি বলেন, আমরা একজন অভিভাবক হারিয়েছি। আমরা আর অভিভাবক হারাতে চাই না। সবাই আমাদের স্যারের জন্য দোয়া করবেন ও আমাদের আলী হোসেন স্যার অত্যন্ত একজন বিনয়ী মানুষ। আমাদের সব সময় খোঁজ খবর নিয়েছেন।
এদিকে মরহুম আবু ইউসুফের বাবা বলেন, ২০০৫ সালে আমার ছেলে এই অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখে। তার স্বপ্নকে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছেন। আমি সবাইকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ সালাম দিচ্ছি।
যার হাত দিয়ে শুরু পিএইচপি কোরানের আলো :
১৭ বছরে আগে দেশের প্রথম রিয়েলিটি শো পিএইচপি কুরআনের আলো’র অনুষ্ঠান শুরু করেন হাফেজ মাওলানা আবু ইউসুফ। দেশের গুণিজন ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব, অকৃত্রিম এক কুরআন প্রেমিক, কুরআনের আলো ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা আবু ইউসুফ ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
এনটিভি আয়োজিত পবিত্র কুরআনবিষয়ক প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ‘পিএইচপি কুরআনের আলো : প্রতিভার সন্ধানে বাংলাদেশ’ এর বিচারক, পরিকল্পনাকারী ও পরিচালক এই ইসলামিক গবেষক ছিলেন হাফেজ মুহাম্মদ আবু ইউসুফ।
১৯৮০ সালে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন হাফেজ মাওলানা আবু ইউসুফ। তিনি বিএসটিআই জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন এই গুণিজন।
মৃত্যুর সময় স্ত্রী, দুই ছেলে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন মাওলানা আবু ইউসুফ।