শুল্ক ইস্যুতে ‘বিস্ফোরক’ সিদ্ধান্তের পথে ট্রাম্প!

প্রতিবারই যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তখনই ধারণা করা হয়েছে যে এটি বিলম্বিত হবে, শিথিল করা হবে বা বাতিল করা হবে।
কিন্তু আজ বুধবার (২ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করতে চলেছেন যে শুল্ককে তিনি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, যাকে তিনি ‘অভিধানের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মুক্তবাজার ব্যবস্থার অবসান ঘটতে পারে। খবর বিবিসির।
এখনও সম্ভাবনা রয়েছে যে তিনি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর একপ্রকার ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ ছুঁড়তে যাচ্ছেন, যা আমদানি করা সমস্ত পণ্যের ওপর সার্বজনীন শুল্ক হিসেবে কার্যকর হবে।
২০ শতাংশ সার্বজনীন শুল্কই একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের দাবি করা বিশাল রাজস্ব—ট্রিলিয়ন ডলার—সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, এই শুল্ক হবে ‘পারস্পরিক’ এবং যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্য অংশীদারদের প্রতি ‘আরও সুন্দর’ আচরণ করবে।
তবে এটি ব্যাপকভাবে ১০ শতাংশ বা ২০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাকে নাকচ করে না, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র মূল্য সংযোজন করকেও (ভ্যাট) একধরনের শুল্ক হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিভিন্ন দেশকে আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে মূলত সার্বজনীন শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। জি-৭ এর এক আলোচক বলেছেন, ‘সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
বিশ্ববাজারে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এই ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে ১ শতাংশ সংকুচিত করতে পারে, যা প্রবৃদ্ধি বন্ধ করে দেবে এবং কর বৃদ্ধি বা ব্যয় সংকোচনের চাপ সৃষ্টি করবে।
অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের এক গবেষণা অনুসারে, এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বব্যাপী মোট ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, কারণ বাণিজ্য স্থানান্তরিত হবে এবং পণ্যের দাম বাড়বে।

শিল্পখাতে ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে। তবে যুক্তরাজ্য যদি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর ছাড়ের ঘোষণা দেয়, তাহলে পরিস্থিতির ভিন্নমাত্রা দেখা যেতে পারে।
বাণিজ্য যুদ্ধ জেতা কঠিন, কিন্তু সবাই হারতে পারে খুব সহজেই
২০ শতাংশ সার্বজনীন শুল্ক বা তার সমতুল্য যে কোনো ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর এক ঐতিহাসিক আঘাত হবে, যা প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রণীত কুখ্যাত স্মুট-হাউলি শুল্কের মতোই প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এর চেয়েও বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত মাসে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে বিশ্বায়ন ব্যর্থ হয়েছে, কারণ ধারণা ছিল যে ধনী দেশগুলো আরও উন্নত শিল্পে এগিয়ে যাবে, আর দরিদ্র দেশগুলো সাধারণ পণ্য উৎপাদন করবে।
কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি, বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বায়নের সেই পুরোনো কাঠামো থেকে সরে আসছে।
আজকের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যদি যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের বেশি দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে চীন এর সুযোগ নিতে প্রস্তুত। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি হলেও যুক্তরাজ্য হয়তো চীন থেকে সস্তায় ইলেকট্রনিক্স, পোশাক ও খেলনা আমদানি করতে পারে, যা মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে না পারলে অন্যত্র চলে যাবে এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে দাম কমাতে সহায়তা করবে।
আজ শুরু হতে যাওয়া এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং বাণিজ্যের কাঠামো বদলাবে না, বরং গোটা বিশ্বের শাসনব্যবস্থার গতিপথও নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।