গোপন চ্যাট ফাঁস : ট্রাম্প প্রশাসনের অবজ্ঞায় হতবাক ইইউ

ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি অনলাইন গ্রুপ চ্যাট ফাঁস হওয়ার পর ইউরোপীয় নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ইউরোপের স্থানীয় সময় সোমবার (২৪ মার্চ) এই চ্যাটের তথ্য প্রকাশিত হলে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা হতবাক হন। খবর বিবিসির।
চ্যাটের আলোচনায় মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র তিন শতাংশ বাণিজ্য সুয়েজ খালের মাধ্যমে চলে, যেখানে ইউরোপের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। এরপর তিনি ও প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউরোপের ‘ফ্রি-লোডিং’ বা বিনামূল্য সুবিধাভোগী মনোভাবের সমালোচনা করেন।
এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।
অন্যদিকে আটলান্টিকের ওপারেও চরম প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক শীর্ষ ইইউ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা দেখার পর যেন পেটে মোচড় দিচ্ছে।’
ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন সেনারা ইউরোপে অবস্থান করছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে ইউরোপে প্রায় এক লাখ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘ফ্রি-লোডার’ বা বিনামূল্যে সুবিধা গ্রহণকারী হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র তার জিডিপির তিন দশমিক সাত শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করলেও, বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোর দুই শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাও পূরণে ব্যর্থ। স্পেন ও ইতালির মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো এখনও এই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

সোমবারের ফাঁস হওয়া চ্যাটে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ওয়াল্টজ ইউরোপের নৌবাহিনীর দুর্বলতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। চ্যাটে একজন সদস্য, ধারণা করা হচ্ছে ডেপুটি হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার, বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি মহাসমুদ্রে বাণিজ্য রক্ষার জন্য ব্যয় করে, তবে ইউরোপ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা উচিত।’
ট্রাম্প প্রশাসনের ইউরোপবিরোধী মনোভাব নতুন কিছু নয়। তার প্রথম মেয়াদে তিনি ইউরোপের কম প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। এ ছাড়া ইউরোপের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি।
এ মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প ইউরোপীয় অ্যালকোহলের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ‘অপমানজনক’ এবং ‘শত্রুপ্রবণ’ বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা খরচ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্পের ন্যাটো বিষয়ক মনোনীত রাষ্ট্রদূত ইউরোপের জন্য পাঁচ শতাংশ জিডিপি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে যুক্তরাজ্য বর্তমানে দুই দশমিক তিন শতাংশ এবং ফ্রান্স দুই দশমিক এক শতাংশ ব্যয় করছে।
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিতে পরিবর্তন আসে। ওয়াশিংটনের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান ও চীনের দিকে চলে যায়। বারাক ওবামা প্রশাসনও এশিয়াকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখার কথা বলেছিলেন।

তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো—তিনি শুধু ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সমালোচনা করেন না, বরং ইউরোপের সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স ইউরোপকে ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বর্তমানে ইউরোপ মার্কিন নিরাপত্তা ছাড়া চলতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা চলছে। রাশিয়ার হুমকি ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।