সিরাজগঞ্জ ছাত্রদলের সাবেক ৮ নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনে ছাত্রদলের সাবেক আট নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। নিজেদের শক্তি জানান দিতে মাঠে নেমেছেন তারা। চলছে, মিটিং, মিছিল, গণসংযোগ। সাবেক ছাত্র নেতাদের সমর্থন জানিয়ে তাদের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচারণা চালাচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর-সদর আংশিক)
এই আসনে সাবেক ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি নাজমুল হাসান রানা ও কাজীপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান। নাজমুল হাসান রানার কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলায় সুপরিচিতি আছে। আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিলেন। বেশ কয়েকবার কারাবরণও করেছেন তিনি। রয়েছে একাধিক মামলাও। গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর কাজীপুরে ব্যাপক শোডাউন করেছেন তিনি। দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতা হিসেবে খ্যাতি রয়েছে তার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে তা প্রত্যাহার করেন। যমুনা নদী বেষ্টিত কাজীপুরের চরাঞ্চলসহ নির্বাচনি এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। নির্বাচনি গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন রানা। বসে নেই রবিউল হাসানও। তিনিও দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতা। মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন তিনিও। তার একটি পা কেটে দিয়েছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। পঙ্গুত্ব নিয়ে তিনি জীবনযাপন করছেন। তিনিও মনোনয়ন প্রত্যাশী।
সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ)
এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মির্জা মোস্তফা জামান ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও দপ্তর সম্পাদক, বর্তমান স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান।জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মির্জা মোস্তফা জামানের বাবা সিরাজগঞ্জ-২ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মির্জা মোরাদুজ্জামান। বাবার মতো সৎ নেতা হিসেবে তারও ব্যাপক সুনাম রয়েছে। একাধিক মামলায় বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন তিনিও। বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতন আন্দোলনে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। তিনি বর্তমানে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিশাল কর্মী বাহিনী ও সমর্থক রয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছে তিনি একজন সৎ ও আদর্শবান নেতা হিসেবে পরিচিত। বাবার অসমাপ্ত কাজ তিনি সমাপ্ত করতে চান। এজন্য তিনি মাঠে কাজ করছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা ও ধানের শীষের ভোট চাইতে তিনি এখন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এদিকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নাজমুল হাসান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি এলাকায় পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে ফেলেছেন। তাকে নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি গণসংযোগ করছেন। তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা সম্পর্কে মানুষকে জানান দিচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ)
রায়গঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভিপি আইনুল হক এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি রায়গঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রায়গঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। নির্বাচনি এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এই আসনে যে কজন প্রার্থী রয়েছেন সবার চেয়ে এগিয়ে তিনি। বিগত সরকার পতন আন্দোলনে তার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মিছিল, মিটিং, সাবেশ, হরতাল, অবরোধ সবখানে তিনি উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার বলিষ্ট নেতৃত্বে হরতাল-অবরোধে মহাসড়ক ছিল তার দখলে। এজন্য তাকে বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব সদস্যরা। রায়গঞ্জ উপজেলায় সর্বোচ্চ মামলার আসামি ও একাধিক বার কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। জনপ্রিয় এই নেতা মনোনয়ন পাবেন বলে নেতাকর্মীরা মনে করছেন।
সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী)
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমীরুল ইসলাম খান আলীম এই আসনে মনোনয়ন পাবেন বলে তার সমর্থকদের ধারণা। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি নির্বাচন করেছেন। জেলার ছয়টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাকে নির্বাচনি এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। মিছিল-সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। হামলা-মামলার শিকার দলীয় নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন তিনি। কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের জামিনের ব্যবস্থা করেছেন তাই তার নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর)
তাঁত সমৃদ্ধ এই আসনে ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও এফ রহমান হলের সাবেক সভাপতি গোলাম সরোয়ার। আরেকজন ছাত্রদল মনোনীত শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ছালাম। তারা দুজনই নির্বাচনি এলাকা শাহজাদপুরে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে শাহজাদপুর। ছাত্রদলের সাবেক এই দুই নেতা ইতোমধ্যে মানুষের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সবখানে।
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী নাজমুল হাসান রানা বলেন, জেলার মধ্যে সব চেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কাজীপুরে বিএনপি নেতাকর্মীরা। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও মোহাম্মদ নাসিমের গুণ্ডা বাহিনীর হামলা, ভাঙচুর, মামলার কারণে গত ১৭ বছর দলীয় নেতাকর্মীরা কাজীপুরে থাকতে পারেনি। তার পরও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন করেছি মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে নেতাদের অনুরোধে আমার মনোনয়নপত্র প্রত্যহার করে আব্দুল মজিদ মিনু ভাইকে দিয়ে দেই। এবারও দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে প্রত্যাশা করি।
সিরাজগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী মির্জা মোস্তফা জামান বলেন, দলের দুসময়ে অনেককে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে চলেছেন। হাসিনার আমলে সিরাজগঞ্জের বিএনপির নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে একাধিকবার কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তার পরও রাজপথ ছাড়িনি। ভয়ে পালিয়ে যাইনি। হরতাল-অবরোধ-মিছিল-মিটিংয়ে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমার বাবা এই আসনের এমপি ছিলেন। সিরাজগঞ্জের মানুষ তাকে সৎ ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে জানে। সেই পথ ধরে আমি এগিয়ে যাচ্ছি। তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা নিয়ে আবারও মাঠে নেমেছি। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী ভিপি আইনুল হক বলেন, বিগত স্বৈরাচার হাসিনা আমলে রাজপথ ছিল আমার ঠিকানা। তা সবাই জানে। মৃত্যুর ভয় করিনি। রাজপথে থেকেছি। হরতাল-অবরোধে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেছি। এজন্য প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ আমার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। বগুড়া থেকে র্যাব আমাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখে। তার পরও আমি দমে যাইনি। আমি রাজপথের মানুষ। রাজপথে আছি, থাকব। দল এবার আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস করি।
সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী শফিকুল ইসলাম ছালাম বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে প্রথম যে দিন আদালত সাজা দেয় সেদিন আমি ঢাকার রাজপথে ছিলাম। পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেলে আহত হই। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে জনসভায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ হামলা চালায়। আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যাই। তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমাকে মেরে রাস্তায় ফেলে যায়। জুলাই গণ-আন্দোলনে বেরিক্যাড ভেঙে আহত হয়েছি। ধানের শীষ প্রতীকের আশায় কাজ করছি। আমি মনে করি, দল এবার আমাকে মূল্যায়ন করবে।